বিশতম অধ্যায় মুখোমুখি সংঘাত

তিন হাজার হত্যার কাহিনী গ্রীষ্মের শেষের ছায়াময় তরঙ্গ 2229শব্দ 2026-02-09 18:59:01

সে মাথা নিচু করল, ঝরঝরে চুলের গোছা তার দীপ্তিময় চোখের ওপর ছায়া ফেলল, আমাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে অবশেষে কিছুটা স্বস্তির স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তুমি ঠিক আছো তো?’’
আমি মাথা নাড়লাম, কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজে উঠল, যেন চোখের ভিতর ভালোবাসার চিহ্ন ফুটে উঠতে চাইছে। ছোট্ট সাদা সত্যিই অসাধারণ, সে শুধু সচেতন, সহানুভূতিশীল ও মধুরই নয়, সময় বুঝে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারেও সে পারদর্শী। সত্যিই ঠিক সময়ে এসে পড়েছে।
সে যখন দেখল আমি মাথা নাড়লাম, অবশেষে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে স্বস্তি পেল, তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফেরাল অন্যান্যদের দিকে, শেষে তার চোখ পড়ল সেই রাজকন্যার ওপর।
শুভ্রজল এখনও চাবুক ধরে আছে, ঘুরে দাঁড়াল, আমাকে আড়াল করে বলল, ‘‘তৃতীয় রাজকন্যা, আপনি কি কিছু ভুল বুঝেছেন? পরিষ্কার করে বললেই তো হয়, হাত তোলার কী দরকার?’’
তৃতীয় রাজকন্যা চাবুকটা ছুঁড়ে দিল, আগুন রঙের চাবুকটি শুভ্রজলের হাত থেকে ছিটকে পড়ল। চাবুকটা দুলিয়ে সে ধীরে ধীরে বলল, ‘‘কোনও ভুল নেই। ওই মেয়েটি আমাকে অপমান করেছে, আমি তাকে শাস্তি দিচ্ছিলাম। তুমি কি তার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে? হম, আগে ভেবে দেখো, সে কিন্তু তোমাদের মন্দিরের শিষ্যা নয়, আর আমার অপমান করা হয়েছে, যা আমাদের দেশের আইন লঙ্ঘন। তোমার কি অধিকার আছে এতে হস্তক্ষেপ করার?’’
শুভ্রজল এটা শুনে মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল আর সন্দিহান চোখে আমার দিকে তাকাল, যেন আমার কাছ থেকে উত্তর চায়। কিন্তু আসলে আমার কিছু বলার ছিল না। এ ধরনের মানুষের সামনে পড়ে আমি নিরুপায়, তবুও বুঝতে পারছি না, কেন সে আমাকে এত অপছন্দ করে।
ইনহুয়া দেখল আমি কিছু বলছি না, সে অধৈর্য হয়ে, লাল মুখে ব্যাখ্যা করল, ‘‘নেতা, ব্যাপারটা এমন নয়। রাজকন্যা আমাদের মন্দিরের শিষ্যদের অপমান করেছেন, বলেছেন আমাদের শিষ্যরাই সবচেয়ে নিচু, নিচু প্রকৃতির, তাই তারা কিছু করতে পারে না...’’
আমি তৎক্ষণাৎ ইনহুয়াকে থামালাম। আমি বুঝেছি, মূল কথা রাজকন্যার অপমান নয়, সে সুযোগ খুঁজছে আমাকে ছোট করার। ইনহুয়া আবার সেটা তুললে, সে আবার অপমান করার সুযোগ পাবে।
আশা মতোই, রাজকন্যা হাত গুটিয়ে হেসে উঠল, ‘‘কী হলো? সত্যি বলেছি বলে বলার অধিকারও নেই? শুভ্রজল, আমি কি মিথ্যে বলেছি?’’
আমি শুভ্রজলের দিকে তাকালাম, ভাবলাম এত সরল ছেলেটি নিশ্চয়ই অপমানিত ও লজ্জায় পড়ে যাবে।
কিন্তু তার উত্তর শুনে আমি অবাক হলাম। শুভ্রজল এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল, ‘‘মন্দিরের প্রধান সবচেয়ে বেশি চান, মন্দিরে শান্তি বজায় থাকুক। রাজকন্যা, আপনিই তো সবচেয়ে ভালো জানেন, এমন কথা ছড়িয়ে পড়লে ভালো কিছু হবে না। দয়া করে রাজকন্যা, নিজেও খেয়াল রাখুন।’’

ওই কথা রাজকন্যার উদ্দেশে যথার্থ ছিল। ভবিষ্যতে সে মন্দিরের প্রধানের স্ত্রী হবে, সেখানে রোজ শিষ্যদের অপমান করা তার মর্যাদা নষ্ট করারই নামান্তর।
দেখলাম, ছোট্ট সাদা তেমন নির্বোধও নয়। সে কি ইনহুয়ার চিন্তা জানে না, নাকি না জানার ভান করছে, কে জানে।
তৃতীয় রাজকন্যা কথা হারিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলল, ‘‘মন্দিরের শিষ্য আমার অপমান ভুলে যেতে পারি, কিন্তু ওকে,’’ সে আমার দিকে আঙুল তুলল, কঠোর গলায় বলল, ‘‘তৃতীয় ভাই, ভালো হয় আপনি আর হস্তক্ষেপ না করেন।’’
শুভ্রজল কিছু বলতে চাইছিল, ঠিক সেই সময় রাজকন্যা হঠাৎ আক্রমণ করল, চাবুক তুলে আবার ছুড়ে দিল। শুভ্রজল আগের মতোই আমার সামনে দাঁড়িয়ে, হাত বাড়িয়ে চাবুকটা টেনে নিল, আগুন-রঙা চাবুক সোজা হয়ে গেল। দু’জন দু’প্রান্ত ধরে টানাটানি শুরু করল। ছোট্ট সাদা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি বলল, ‘‘রাজকন্যা, মন্দিরের প্রধান নিজে বলেছেন, আমাকে ওর খেয়াল রাখতে হবে। ওর ক্ষতি হলে আমি দায় নিতে পারব না, দয়া করে আপনার দয়ালুতা দেখান।’’

ছোট্ট সাদা পুরো শরীর দিয়ে আমাকে আড়াল করে দাঁড়াল। রাজকন্যা এক হাতে চাবুক, অন্য হাতে আঙুল ভাঁজ করে বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ছুঁইয়ে এক ধরনের মুদ্রা ধরল, হঠাৎ রেগে উঠে বলল, ‘‘মন্দিরের প্রধানের নাম আর ব্যবহার করবেন না। আজ সরে না দাঁড়ালে আমি কঠোর হতে বাধ্য হব।’’

আমি মনে মনে ভাবলাম, এবার কি সত্যিই লড়াই লাগবে? যদিও মন কাঁপছিল, তবু কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না—ছোট্ট সাদা আর রাজকন্যার মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী? রাজকন্যা এত উদ্ধত, ছোট্ট সাদা কি পারবে তাকে সামলাতে?
ছোট্ট সাদা ভয় পায়নি, নিজের তরবারি তুলে সামনে ধরল, ধীরস্বরে বলল, ‘‘রাজকন্যা, আমাকে বাধ্য করবেন না। এটা মন্দির প্রধানের আদেশ, আমি মানতেই হবে।’’

একটু থেমে, শুভ্রজল হঠাৎ পাশের ছায়াময় গাছের নিচে তাকিয়ে বলল, ‘‘দয়া করে বড় ভাই, আপনি এগিয়ে এসে সমাধান করুন।’’

শুভ্রজলের দৃষ্টিতে আমি চেয়ে দেখলাম, মুখ গম্ভীর সেই যুবক এখনও সেখানে। দিব্যি দাঁড়িয়ে নাটক দেখছে। এমন নির্লিপ্ত থাকাটা বড় ভাইয়ের মানে আঘাত।
তবে ভাবলাম, রাজকন্যার লক্ষ্য তো আসলে আমি; আমি তো মন্দিরের শিষ্যও নই, বড় ভাইয়ের আসলে কিছু করার কারণ নেই। এই ভাবনায় আবার থেমে গেলাম।

মুখ গম্ভীর যুবকটা ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার গায়ে সাদা চাদর বেশ উঁচু করে টানা, এবার লক্ষ্য করলাম, তার পোশাক অন্যদের চেয়ে আলাদা—কলারটা এত উঁচু যে গলাটাও ঢাকা, শরীরের কোথাও চামড়া দেখা যায় না। মুখ সাদা, চুল সামান্য ঢেউ খেলানো, হাঁটেও ধীর গতিতে, কারও দিকে না তাকিয়ে, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, কিন্তু তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
তার পেছনে আরও চারজন, যেমন চাঁদের কিরণ সবসময় তার সঙ্গে থাকে। তাদের মধ্যে একজন বেগুনি পোশাক পরা, চেহারায় গাম্ভীর্য, নিশ্চয়ই অন্য মন্দিরের ছোট দলের নেতা, বেশ কঠোর প্রকৃতির। আরেকজন দেহে পেশী ফুলে আছে, পুরনো যুদ্ধবাজদের মতো, হাতে রক্তবর্ণ তরবারি—ওর হাতে ওই তরবারি দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল, নিশ্চয়ই সে অল্পতেই রেগে যায়।
বাম পাশে যে, সে দেখতে অতি চিত্তাকর্ষক, আচরণে স্বতঃস্ফূর্ত, হাতে সুন্দর ফ্যান নিয়ে যেন কোনো কবি-রূপকথার চরিত্র।
আরও বাঁ দিকে যাকে দেখলাম, ভাবলাম, এ তো সেই ধরনের চরিত্র, যাদের নিয়ে আধুনিক কালে নানা গল্প হয়। দেখতে খুবই মোলায়েম, ত্বক চকচকে, চোখের কোণে একটি তিল, বিশেষ করে বড় বড় জলের মতো দুটি চোখের নিচে সেই তিল, খুবই আকর্ষণীয়। এবার বুঝতে পারলাম, কেন অনেক পুরুষ পুরুষকেই পছন্দ করে—কারণ কখনও কখনও পুরুষরাই নারীদের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।
কিন্তু তার সেই দৃষ্টি দেখে অবাক লাগল, এত ঘৃণা নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে কেন? আমি আবার কী অপরাধ করেছি?
আমি ভাবছিলাম, কবে আবার নতুন শত্রুর সৃষ্টি করলাম, তখনই মুখ গম্ভীর যুবকটি আমার সামনে এসে দাঁড়াল, আবারও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে আমাকে দেখে ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘‘সবাই থামো।’’