দ্বিতীয় অধ্যায়: গভীর রাতের ট্যাক্সি

Terror: Arquivos Sobrenaturais A pasta de dentes silenciosa 2730শব্দ 2026-08-03 18:47:31

ঘন অন্ধকার যেন গলানো আলকাতরার মতো গাড়ির শরীরটাকে জড়িয়ে ধরেছে। টায়ারের নিচে নুড়ি পাথরের ঘর্ষণের শব্দ অসীম উচ্চগ্রামে পৌঁছেছে, মনে হচ্ছে অসংখ্য নখ যেন ধাতব কাঠামোয় আঁচড় কাটছে।

আমি পেছনের সিটে গুটিসুটি মেরে বসে মিটারের লাল আলো কাঁচের ওপর নাচতে দেখছি। সেই ছন্দময় স্পন্দন আর এয়ার কন্ডিশনারের গুনগুন শব্দ মিলে আমার কপালে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে।

গাড়ির ঘড়িতে সময় রাত ১:৪৭। এয়ার কন্ডিশনারের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস জীবাণুনাশকের গন্ধে ভারী—ঠিক হাসপাতালের মর্গ থেকে আসা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট আর পচা মাংসের মিশ্রিত সেই গন্ধ। তা আমার ঘাড়ের লোমকূপ দিয়ে ঢুকে মেরুদণ্ডে বরফের সূঁচের মতো বিঁধছে।

"ড্রাইভার সাহেব, সামনে ডানে মোড় নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠুন।"

আমি তৃতীয়বারের মতো গন্তব্য জানালাম, কিন্তু আমার কথার শেষ অংশ ইঞ্জিনের হঠাৎ বেড়ে যাওয়া গর্জনে তলিয়ে গেল।

আমার মোবাইল ধরা তালু ঠান্ডায় ঘামছে, ফোনের বাইরের আবরণটা এতটাই চটচটে যে হাত থেকে ফসকে পড়ার উপক্রম। ড্রাইভার কোনো উত্তর দিচ্ছে না। রিয়ারভিউ মিররে শুধু তার সাদা হাত দুটো স্টিয়ারিং ধরে থাকতে দেখছি; কবজির হাড়গুলো যেন ময়নাতদন্তের পর নীলচে ছোপ ধরা কোনো মৃতদেহের অঙ্গ। তার অতিরিক্ত ইস্ত্রি করা সাদা শার্টের কলার থেকে ন্যাপথলিনের উৎকট গন্ধ বেরোচ্ছে।

গাড়ির চাকা স্পিড ব্রেকারের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় একটা ফাঁপা প্রতিধ্বনি হলো, যেন কোনো নাড়িভুঁড়ি বের করা মৃতদেহের ওপর দিয়ে চাকা চলে গেল।

হঠাৎ খেয়াল করলাম, সামনের কাঁচ অস্বাভাবিক রকমের পরিষ্কার। চাঁদের আলো কাঁচের ওপর চটচটে জেলের মতো গড়িয়ে পড়ছে। কোনো সার্ভিস কার্ড নেই, কোনো সুরক্ষাকবজ নেই, এমনকি গাড়ির বাৎসরিক পরীক্ষার চিহ্নও নেই। ড্যাশবোর্ডের নীলচে শীতল আলোয় মিটারের সংখ্যাগুলো পাগলের মতো লাফাতে শুরু করল। এলসিডি স্ক্রিন থেকে বৈদ্যুতিক যন্ত্র পুড়ে যাওয়ার কটু গন্ধ আসছে। ভাড়া যখন ৪৩ থেকে হঠাৎ ১২৭ টাকা হয়ে গেল, তখন সিটের নিচ থেকে টপ টপ করে জল পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম।

"ড্রাইভার সাহেব! মিটার নষ্ট হয়ে গেছে!"

আমি সোজা হয়ে বসলাম, সিটবেল্টটা গলার কাছে চেপে ধরতেই পচা চামড়ার ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। ঘাড়ের ওপর দিয়ে হঠাৎ এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল, যেন কেউ ফ্রিজের ভেতর থেকে আসা বরফশীতল নিশ্বাস আমার ত্বকের ওপর ছেড়ে দিল।

রিয়ারভিউ মিররে ড্রাইভিং সিটটা একদম খালি। শুধু সেই সাদা শার্টটা গাড়ি চালানোর ভঙ্গিতে স্থির হয়ে আছে। হাতার নিচ থেকে বেরিয়ে আছে ফ্যাকাশে সাদা কবজির হাড়। স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাড়ের ঘর্ষণের খসখস শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

ঠিক তখনই মোবাইলটা নিজে থেকেই জ্বলে উঠল, লক স্ক্রিনের ছবির ওপর সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিল। কাঁচ চুরমার হওয়ার শব্দে আমি কেঁপে উঠলাম। কাঁপাকাঁপা হাতে রাইড-শেয়ারিং অ্যাপটি খুললাম, কিন্তু যাত্রীদের মন্তব্যের পাতায় শুধু অসংলগ্ন কোড আর হাজার হাজার ‘মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যু’ শব্দগুলো কৃমির মতো কিলবিল করছে।

সর্বশেষ মন্তব্যের সময় দেখাচ্ছে ১৫ জুলাই, ২০৩৫।

"সে যেন না দেখে যে তুমি আয়নায় তাকিয়ে আছ," স্পিকার থেকে যান্ত্রিক এক নারীর কণ্ঠস্বর বিস্ফোরিত হলো, কানের পর্দা যেন ফেটে যাচ্ছে।

টায়ারের তীব্র আর্তনাদে গাড়িটি টানেলের ভেতর ঢুকে পড়ল। পচা গন্ধটা দশ গুণ বেড়ে গেল, যেন কোনো ফুলে যাওয়া ভাসমান লাশের পেট চিরে ফেলা হয়েছে। উজ্জ্বল এলইডি বাতিগুলো নিভে গেল। নীলচে ধূসর দেয়ালে লতার মতো ফাটল আর গাঢ় লাল আঠালো তরল চুইয়ে পড়ছে। ছাদের ওপর সেই তরল পড়ার শব্দ যেন গরম তেলে মাংস ভাজার মতো।

পঞ্চাশ মিটার সামনে দেখলাম সাদা পোশাক পরা এক নারী শুয়ে আছে, তার লম্বা চুলগুলো জলের শৈবালের মতো বাতাসে উড়ছে। জানালার কাঁচ ঘেঁষে যাওয়ার সময় চুলের ডগা রক্তমাখা এক লতানো দাগ রেখে গেল।

"গাড়ি থামান!"

আমি পাগলের মতো পার্টিশনে আঘাত করতে লাগলাম, নখের আঁচড়ে অর্গানিক কাঁচ থেকে দাঁত শিরশির করা শব্দ বের হচ্ছে। নখের ফাঁকে স্বচ্ছ গুঁড়ো ঢুকে গেছে।

রিয়ারভিউ মিররে হঠাৎ ড্রাইভারের মুখ ভেসে উঠল। সেটা তো মুখ নয়, যেন কোনো চেপে চ্যাপ্টা করা সিলিকনের মুখোশ! কালো বোতামের মতো চোখ দিয়ে আলকাতরার মতো তরল গড়িয়ে পড়ছে, যা লেদারের সিটে পড়তেই সাদা ধোঁয়া উঠছে। ড্যাশবোর্ড থেকে গাঢ় লাল রক্ত চুইয়ে ‘বর্তমান গতি ১১৭ কিমি’ লেখা স্ক্রিনের ওপর এঁকে দিল চারটি শব্দ:

আর ৯ বার বাকি। প্রতিটি অক্ষর কৃমির মতো ধীরে ধীরে নড়ছে।

টানেলের শেষে ফ্লাইওভারের সেই পরিচিত প্রবেশপথ দেখা গেল। চাঁদের আলো ঘোলাটে কমলা রঙ ধারণ করেছে। ওই নারীর মাথার ওপর দিয়ে চাকা চলে যাওয়ার সময় কোনো ঝাঁকুনি হলো না, শুধু পচা ফোড়া ফাটার মতো একটা গুমোট শব্দ গাড়ির নিচে প্রতিধ্বনিত হলো। আয়নার সেই সিলিকন মুখোশটা গলে যাচ্ছে, গলিত আঠার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে হাড়। চোয়াল খোলার সময় শুকনো ডাল ভাঙার মতো শব্দ হলো:

"মিস্টার লিউ, আমরা এখন দুর্ঘটনার প্রবণ এলাকা দিয়ে যাচ্ছি।"

ড্রাইভারের কণ্ঠস্বর যেন মরচে ধরা ব্লেড দিয়ে কানের পর্দা চেঁছে দিল। গাড়িতে ওঠার পর এটাই তার প্রথম কথা।

নেভিগেশন স্ক্রিনটা হঠাৎ লাল আলোয় জ্বলে উঠল। ম্যাপের জায়গায় এখন সিসিটিভি ফুটেজ চলছে: কুড়ি সেকেন্ড আগে খাদে পড়ে যাওয়া ট্যাক্সিটি নবমবারের মতো ফ্লাইওভারে উঠছে।狹窄 গাড়ির ভেতর সংঘর্ষ আর কাঁচ ভাঙার শব্দ এক ঘূর্ণি তৈরি করল।

পেছনের সিটের আলোটা আসা-যাওয়া করছে। সেই আলোয় ড্রাইভারের কোটের ভেতরের সোনালি অক্ষরে লেখাটা দেখতে পেলাম—‘ইয়োংআনজু ফিউনারেল হোম’। তার শার্টের কলারের রুপালি পদ্ম চিহ্নটা ঘুরতে শুরু করল, পাপড়ির ফাঁক দিয়ে রক্তের বিন্দু ঝরে আমার কালো প্যান্টে পুড়ে ফুটো তৈরি করল।

হঠাৎ কোনো পিচ্ছিল জিনিস আমার গোড়ালি জড়িয়ে ধরল। নিচে তাকিয়ে দেখি সিটবেল্টটা কখন যেন আধা-স্বচ্ছ অন্ত্রের নালীতে পরিণত হয়েছে। আমার ধস্তাধস্তিতে তা থেকে দুর্গন্ধযুক্ত আঠালো তরল বেরোচ্ছে, অক্টোপাসের শুঁড়ের মতো তা আমার উরুর দিকে উঠে আসছে।

"আমাকে নামিয়ে দাও!"

আমি ব্যাকপ্যাক দিয়ে পার্টিশনে আঘাত করলাম। ধাতব বাকল আর কাঁচের সংঘর্ষে কসমেটিকস আর নোটবুক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। একটা লিপস্টিক সিটের ফাঁকে গড়িয়ে গেল, চাঁদের আলোয় তার মোমের মতো ফ্যাকাসে বর্ণ দেখা যাচ্ছে।

একটা পরিচয়পত্র ফাটলের মাঝে আটকে ছিল। প্লাস্টিকের নিচে হলদেটে ছবিতে আমারই মুখ, কিন্তু ইস্যুর তারিখটা তিন দিন পরের—১৫ জুলাই। কালি থেকে কবরের মাটির মতো এক অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ বেরোচ্ছে।

গাড়িটা তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। টানেলের দেয়াল খসে পড়ছে, কংক্রিটের টুকরো ছাদের ওপর শিলাবৃষ্টির মতো আছড়ে পড়ছে। দেয়াল খসে পড়ার আড়ালে আরেকটি হুবহু টানেল বেরিয়ে এল। আর্দ্র ঠান্ডা বাতাস চিতার ছাইয়ের কণা নিয়ে গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল।

সাদা পোশাকের সেই নারী এখন সামনের সিটে বসে আছে। তার মাথার পেছনের অংশ ধীরে ধীরে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। পচন ধরা মুখটা পার্টিশনের কাঁচের সাথে লাগানো, মাড়ি থেকে কৃমি খসে পড়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে:

"এবার তোমার পালা।"

ড্যাশবোর্ড থেকে তীক্ষ্ণ ইলেকট্রনিক শব্দ এল। রক্তের অক্ষরে লেখাটা বদলে হলো ‘আর ৮ বার বাকি’। স্ক্রিনের ওপর জমে থাকা রক্তের বিন্দুগুলো টপ টপ করে সামনের কাঁচে ঝরছে।

রিয়ারভিউ মিররে দেখলাম, আমার নিজের মুখটা এক ভয়ংকর হাসিতে ভরে উঠেছে। কানের লতি পর্যন্ত মুখটা ছিঁড়ে যাওয়ার মাংসপেশির শব্দ দাঁত শিরশির করে তুলল। আমার ডান হাতটা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে জানালার বোতামের দিকে এগিয়ে গেল। আঙুল ছোঁয়ার সাথে সাথে ধাতব তলটা পচা মাংসের মতো দেবে গেল।

ঠান্ডা বাতাস গাড়িতে ঢোকার মুহূর্তে শুনলাম মহাশূন্য থেকে আসা একের পর এক ব্রেকের শব্দ। তেরোটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ট্যাক্সি বিভিন্ন দিক থেকে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। ভাঙা হেডলাইটগুলো তৃষ্ণার্ত চোখের মতো জ্বলছে, টায়ারের আর্তনাদে হাড় ভাঙার শব্দ মিশে আছে।

সংঘর্ষের ঠিক আগের মুহূর্তে মোবাইলে টাকা জমা হওয়ার সেই পরিচিত শব্দ বেজে উঠল। আমার হাত যখন দরজার কাঁচ ভেদ করে বেরিয়ে এল, তখন আলকাতরা মাখা রাস্তার উত্তাপ আর কাঁচের যন্ত্রণা অনুভব করলাম। মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে আমার নাক ভরে উঠল প্লাস্টিক পোড়া গন্ধে।

ভোরের আলো মেঘ ফুঁড়ে বেরোতেই দেখলাম আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টের বিছানায় শুয়ে আছি। মোবাইলে রাত ৩:৪০ মিনিটের ট্রিপ পেমেন্টের রসিদ দেখাচ্ছে। ডিটেইলস খুলতেই পপ-আপ এল—‘এই অর্ডারটি অস্তিত্বহীন’। স্পিকার থেকে এক নারীর উন্মাদ হাসির শব্দ ভেসে এল।

বিছানার পাশে শ্যাওলা ধরা ট্যাক্সির ভাড়া রসিদ পড়ে আছে। তার উল্টো পিঠে রক্ত দিয়ে নয়টি লম্বালম্বি দাগ টানা। শুকনো রক্তের দাগ বিছানার চাদরের ভাঁজে ছড়িয়ে পড়ছে, লোহার মরচে আর পচা পনিরের এক অদ্ভুত মিশ্র গন্ধ বেরোচ্ছে।

আমি যখন অফিসে দৌড়ে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলাম, ভোরের সেই ভিডিওতে দেখা গেল: রাত ১:৩০ মিনিটে সাদা শার্ট পরা এক লোক আমার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে কফির কাপে সেই রুপালি পদ্ম চিহ্নটা ফেলছে। ভিডিওতে জুতো দিয়ে মেঝেতে টোকা দেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে, প্রতিটি শব্দ আমার হৃৎস্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে পড়ছে, আর আমার কফির কাপ থেকে কালো আঠালো তরল চুইয়ে পড়ছে।

ঠিক এই মুহূর্তে লিফটের দিক থেকে সেই পরিচিত জীবাণুনাশকের গন্ধ আসছে, সাথে শ্মশানের পচা ফুলের টক গন্ধ। ফ্লোর ডিসপ্লের সংখ্যাগুলো পাগলের মতো লাফাচ্ছে, লিফটের ধাতব তারের আর্তনাদ মাথার ওপর থেকে শোনা যাচ্ছে। মসৃণ ধাতব দরজায় আমার পেছনের প্রতিবিম্ব ফুটে উঠল। সেই অতিরিক্ত ইস্ত্রি করা সাদা শার্টের কলারটা ধীরে ধীরে আমার ঘাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। ঠান্ডা আঙুলগুলো যখন কাঁধে এসে বসল, তখন নিজের ঘাড়ের চামড়া জমে বরফ হওয়ার সেই সূক্ষ্ম খসখস শব্দ শুনতে পেলাম...